সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া : নিরাপত্তার ভ্রান্ত বিলাস:-
অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-দেশের সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের ইতিহাস মানব সভ্যতার প্রাচীনতম এবং চলমান অধ্যায়গুলোর একটি ।
প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত, দেশগুলো ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষা, অনুপ্রবেশ রোধ এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব জাহিরের জন্য প্রাচীর নির্মাণ করে আসছে । প্রাচীন কালে প্রাচীর নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্যগুলোকে রক্ষা করা ।
মঙ্গলীয় আক্রমণকারীদের হাত থেকে চীনকে রক্ষার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত সীমান্ত প্রাচীর ( "গ্রেট ওয়াল" ) তৈরি শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে, চলে কয়েকশো বছর ধরে । ১১৭ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট এড্রিয়ান রোমান সাম্রাজ্যের উত্তর সীমান্ত চিহ্নিত করা এবং বর্বর উপজাতিদের আক্রমণ ঠেকানোর লক্ষ্যে "এড্রিয়ান'স ওয়াল" নির্মাণ করেন ।
মধ্যযুগের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় নগরের চারপাশে 'সিটি ওয়াল' বা দুর্গের চারপাশে প্রাচীর তোলা হতো । আধুনিক যুগে জাতিগোষ্ঠীর ধারণা আসার পর প্রাচীর নির্মাণের উদ্দেশ্য বদলে যায় । এটি এখন কেবল সুরক্ষা নয়, রাজনৈতিক আদর্শ এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে । বার্লিন প্রাচীর ১৯৬১ সালে পূর্ব জার্মানি তৈরি করে, যা সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী বিশ্বের বিভাজনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় ।
১৯৯১ সালে এই দেয়ালটি ভেঙ্গে ফেলার মধ্য দিয়ে শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে । ১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধের পর তৈরি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে পৃথিবীর কঠিনতম পাহারাযুক্ত প্রাচীর " বার্লিন ওয়াল" তৈরি করা হয়, যা দুই দেশের বৈরী সম্পর্কের সাক্ষী । প্রাচীনকালে প্রাচীর ছিল সামরিক নিরাপত্তার ঢাল । আর আধুনিক যুগে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার ।
প্রযুক্তির উৎকর্ষ বাড়লেও মানুষের মনে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস ও নিরাপত্তার অভাব আজও প্রাচীর নির্মাণের ইতিহাসকে দীর্ঘায়িত করে চলছে । পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও কেউ বাড়ি তৈরি করার আগেই উঁচু সীমানা প্রাচীর তৈরি করে । কখনো কখনো দেয়ালের উপর কাঁটাতার পেঁচিয়ে প্রাচীরকে আরো উঁচু করা হয় ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া বা প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণের প্রবণতা বর্তমানে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে । জাতীয় নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ রোধ, এবং অবৈধ বাণিজ্য বন্ধের দোহাই দিয়ে দেশগুলো নিজেদের অন্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে । শীতল যুদ্ধের সময় (১৯৮৯) বিশ্বে প্রাচীরের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬ টি । বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ টিরও বেশি ।
বর্তমান বিশ্বে উল্লেখযোগ্য কাঁটাতারের বেড়াগুলো হচ্ছে:
* পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তান ২৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ 'ডুরান্ড লাইন' কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে
* সৌদি আরব ইরাকের মধ্যে ৯০০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে
* ইরান পাকিস্তান সীমান্তে ৭০০ কিলোমিটার প্রাচীর ও বেড়া নির্মাণ করেছে
* তুরস্ক সিরিয়ার বর্ডারে ৮৩৭ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ করেছে
* সৌদি আরব ইয়েমেনিদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে
* উজবেকিস্তান ও আফগানিস্তানের বর্ডারে কাঁটাতারের বেড়া আছে
* মরক্কো ও আলজেরিয়ার সীমান্তেও কাঁটাতারের বেড়া আছে
এছাড়াও চীন, থাইল্যান্ড, উত্তর কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, হাঙ্গেরি, স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউক্রেন, বুলগেরিয়া, লিথুনিয়া, ম্যাসেডোনিয়া ও গ্রিস তাদের নিজ নিজ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসিয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াটি বিশ্বের দীর্ঘতম কাঁটাতারের বেড়া হতে যাচ্ছে । যার দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬ কিলোমিটার । ভারত এই সীমান্তের প্রায় ৮০ শতাংশ অংশে ইতিমধ্যেই বেড়া নির্মাণ শেষ করেছে ।
ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের অবশিষ্ট অংশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার জন্য ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ'কে প্রয়োজনীয় জমি ৪৫ দিনের মধ্যে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, "নিরাপত্তা রক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার, এই সিদ্ধান্ত আমরা সেই দৃষ্টিতে দেখি" (১২/৫/২০২৬) ।
এ প্রসঙ্গে একই দিন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, "নোম্যান্স ল্যান্ড (শূন্য রেখা) বজায় রেখে ভারত নিজেদের সীমানার ভেতর কোন ব্যবস্থা নিতে চাইলে সেটি কূটনৈতিকভাবে আলোচনা হবে" । বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যটি কূটনৈতিক হলেও এতে বুঝতে বাকি থাকে না যে, 'ভারত তার নিজ সীমানার ভিতরে বেড়া দিলে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের তেমন কিছু করার নেই'।
রণধীর জয়সোয়াল ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের নির্মাণের যৌক্তিকতা হিসেবে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন । প্রশ্ন হচ্ছে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বা প্রাচীর নির্মাণ করে জাতীয় নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত করা যায় । চীনের উত্তর সীমান্তের যাযাবর উপজাতির শক্তিশালী বহিরাগত শত্রুদের ঠেকাতে বিভিন্ন রাজবংশ প্রায় দুই হাজার বছর যাবত চীনের মহাপ্রাচীর তৈরি ও সংস্কার করে ।
তারপরও এটি কোন অবভেদ্য সমাধান ছিল না । পাহারাদারদের বিশ্বাসঘাতকতাকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে ঘুষ দিয়ে বা রাজনৈতিক সুবিধা দিয়ে শত্রুরা বহুবার গেট খুলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছিল । চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মোঙ্গল বাহিনী (উইনান রাজবংশ) এবং পরবর্তীতে কিং রাজবংশ প্রাচীর অতিক্রম করে সমগ্র চীন দখল করে নিয়েছিল ।
আধুনিক কালে ইসরাইল কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করে গাঁজা সীমান্তে আধুনিক স্মার্ট বেড়া তৈরি করেছিল যাতে সেন্সর, ক্যামেরা এবং ভূগর্ভস্থ দেয়াল ছিল । কিন্তু ২০২৩ সালে অক্টোবরে হামাস সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে সেগুলো অকেজো করে দেয় এবং বুলডোজার দিয়ে বেড়া ভেঙ্গে অনায়াসে ভেতরে ঢুকে পড়ে ।
এতে প্রমাণিত হয় এমনকি আধুনিক প্রযুক্তি বা ভৌত অবকাঠামো দিয়ে আধুনিক গেরিলা আক্রমণ ঠেকানো সম্ভব নয় । সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলোতে সীমান্ত নিরাপত্তায় কাঁটাতারের বেড়া এবং এর কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে । ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে দেখা গেছে হাজার মাইল জুড়ে বেড়া বা পরিখা থাকলেও ড্রোন এবং মিসাইলের নিকট সেগুলো তুচ্ছ ।
আকাশ পথের নিরাপত্তার কাছে স্থলপথের কাঁটাতারের বেড়া অনেকটা সেকেলে হয়ে পড়েছে । বরং এর মাধ্যমে যে "নিরাপত্তার ফলস সেন্স' (" false sense of security" ) তৈরি করে এটা আরো ক্ষতিকর । ট্যাংক ও ভারী সাঁজোয়া জানের কাছে বেড়া বা পরিখা কোন বাঁধাই নয় ।
সারা বিশ্বের সীমান্তে চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ বিষয়টি পর্যালোচনা করে বলা যায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যায় না । কেবলমাত্র এর গতি কমানো যায় এবং প্রক্রিয়াটিকে ব্যয়বহুল করা যায় । দুর্নীতি ও পারস্পরিক জোগসাজস থাকলে বেড়া ডিঙিয়ে যাওয়া কোন ব্যাপারই না । চোরাকারবারি এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা তখন দুর্গম ও বিপজ্জনক এলাকা ব্যবহার করে ।
চোরাকারবারিরা কৌশল পরিবর্তন করে প্রায়ই । মই ব্যবহার করে, সুরঙ্গ তৈরি করে, বা বেড়া কেটে এক দেশ থেকে আরেক দেশে মালামাল স্থানান্তর করে । বিভিন্ন দেশের কাঁটাতারের বেড়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা হচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনা, শুধু চোরাকারবারি ও অনুপ্রবেশেকারীদের খরচ ও সময় বাড়িয়ে দেয় ।
সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বাড়তি সুবিধা প্রাপ্তির সুযোগ করে দেয় । ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে সীমান্তে হত্যা । ভারতের দিক থেকে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করলেও কিছুতেই সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না । সীমান্ত হত্যা অন্যতম একটি উদ্বেগের কারণ ।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এর সমালোচনা করছে । সীমান্ত হত্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে গরু চোরাচালান । ভারত থেকে বৈধভাবে গরু রপ্তানির কোন সুযোগ না থাকলেও অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন প্রচুর গরু বাংলাদেশে ডুকছে । উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর যোগসাজসে এমনটি হয় বলেই অনেকে মনে করেন ।
সীমান্ত এলাকায় বাড়ি হওয়ার কারণে সীমান্তের উভয় পাশে কারফিউ জারি করে মালামাল এপার-ওপার করতে দেখেছি । মাইকিং করে চোরাচালান প্রতিহত করার জন্য কারফিউর ঘোষণা দিলেও মূল উদ্দেশ্য ছিল জন চক্ষুর অন্তরালে চোরাকারবারিদের সুযোগ করে দেয়া । ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত সংক্রান্ত বৈঠকগুলোতে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি আসলেও হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না ।
গরুকে কেন্দ্র করে সীমান্তে যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয় তার সাথে একটি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা জড়িত আছে বলে অনেকেই মনে করেন । আর সেটা হচ্ছে, ভারতের একটি বড় অংশের মানুষের কাছে গরু ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত প্রবিত্র। বিএসএফ সদস্যদের একটি বড় অংশ সেই সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট থেকে আসেন ।
ফলে সীমান্তে গরু পাচার ঠেকানোর ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত আবেগীয় তাড়না কাজ করে বলেই অনেকে মনে করেন । মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের এই ব্যক্তিগত মূল্যবোধ তাদের পেশাদারিত্বের উপর প্রভাব ফেলে যা পরিস্থিতির সহিংসতাকে বাড়িয়ে দেয় । গত এক দশকে ভারতে "গো-রক্ষা" বিষয়টি একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
এ ব্যাপারে সরকারের কড়াকড়ি ও রাজনৈতিক চাপ বিএসএফ এর উপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলে । যার কারণে আইন প্রয়োগের চেয়ে বল প্রয়োগকে প্রাধান্য দেয়ার মানসিকতার তৈরি হতে পারে । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুলিতে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা নিরস্র এবং সাধারণত দরিদ্র লোকজন, চুক্তিভিত্তিতে চোরাকারবারির সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করে ।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে যথাক্রমে ৩০ ও ৩৪ জন বাংলাদেশি বিএসএফের হাতে সীমান্ত হত্যার শিকার হন । আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে তাদের প্রাণনাশের প্রয়োজন ছিল না । পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সীমান্তে চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন ।
রাজ্যের সমস্ত অবৈধ পশুর হাট বন্ধ করা হয়েছে । পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে । কলকাতা নিউমার্কেট এলাকার (হগ মার্কেট) মাংসের দোকানগুলো বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিয়েছে বলে খবর এসেছে । সীমান্তে গরু নিয়ে যত বাড়াবাড়ি হবে অবৈধ চোরাচালাননের সম্ভাবনাও তত বেড়ে যাবে । কাঁটাতার দিয়ে সেটা ঠেকানো যাবে না ।
মানুষের অবৈধ আসা-যাওয়া বেড়ার কাছে এসে ঠেকে যাবে না । সমতল ভূমিতে কাঁটাতারের বেড়া দিলে মানুষ পাহাড়ি ও নদীপথে গমনাগমন বাড়িয়ে দিবে । কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচল বাধা দেয়া ছাড়া আর তেমন কোন ফল দেবে না (গারো পাহাড় সংলগ্ন সীমান্তে এশিয়ান হাতির চলাচল বিঘ্নিত হবে)। শুরুতেই বলেছি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এ যুগে কোন দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না ।
তবে এর পরিবর্তে বেড়াবিহীন আধুনিক 'স্মার্ট ওয়াল' প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে । শুনেছি দুর্গম অঞ্চলে বিষধর সাপ এবং কুমির ছেড়ে সীমান্ত পাহারা দেয়ার মত হাস্যকর উদ্যোগের কথাও বলা হচ্ছে । এক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে সাপ এবং কুমিরকে সীমান্ত পারাপারে বাধা দিবে কে ? বাস্তবতা হচ্ছে, এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ অতি অল্পোই ঠেকানো যাবে ।
২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো সীমান্তে উচ্চ প্রযুক্তির এলইডি লাইটিং, ফাইবার অপটিক সেন্সর, ইনফ্রারেড ক্যামেরা, রাডার এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন সমৃদ্ধ 'স্মার্ট ওয়াল' ব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে । সীমান্তে পণ্যের চোরাকারবার উভয় দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর ।
ভারত থেকে অবৈধ পথে পন্য সামগ্রী ঢুকলে বাংলাদেশ সরকার রাজস্ব হারায়, বৈধ আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা বিঘ্নিত হয় । এছাড়াও চোরাকারীদের হাতধরে মাদকদ্রব্য ও অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করে । বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য এবং অবৈধ অস্ত্রের বেশির ভাগই ভারত থেকে বা ভারত হয়ে আসে বলে অভিযোগ আছে ।
সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর "স্মার্ট বর্ডার ব্যবস্থাপনা" বাংলাদেশেরও অন্যতম চাওয়া হওয়া উচিত । উভয় দেশের মধ্যে সফল কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমেই সীমান্তের সমস্যা সমাধান সম্ভব। এক্ষেত্রে কাঁটাতার কেবল অবিশ্বাস এবং আস্থাহীনতাই বাড়াবে, সমস্যার সমাধানে কোন কাজে আসবে না ।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে সকল যুদ্ধ বর্তমানে চলমান আছে তার বেশির ভাগই সীমানা নিয়ে । অনেকটা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল ও চরাঞ্চলের মতো । জমির সীমানাই বিরোধের মূল কারণ । বাংলাদেশের বেশিরভাগ মামলা মোকদ্দমাই জমি-জমা সংক্রান্ত । সীমানা নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক বিরোধ চলছে পৃথিবীর দেশে দেশে । ভারত পাকিস্তান স্বাধীনতার পর থেকেই কাশ্মীর অঞ্চল নিয়ে কয়েকবার যুদ্ধে জড়িয়েছে ।
লাদাখ এবং অরুণাচল নিয়ে চীন ভারতের মধ্যে স্থানীয় যুদ্ধ বেঁধেছে কয়েকবার । কয়েকটি দ্বীপ ও সমুদ্র সীমানা নিয়ে পার্শ্ববর্তী ৫-৬ টি দেশের সাথে তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে চীনের । এ নিয়ে ফিলিপিন্স ও ভিয়েতনামের সাথে প্রায়ই সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় । জাপানের মধ্যে জলসীমাহীন সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধ চলছে । কুড়িল দ্বীপ নিয়ে জাপানের সাথে রাশিয়ার বিরোধ আজও মিটেনি ।
পাকিস্তানের সাথে 'ডুরান্ড লাইনের' সীমান্তকে আফগানরা মানছে না, দুই দেশের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া থাকা সত্ত্বেও সশস্ত্র সংঘর্ষ চলছে । থাইল্যান্ড সীমান্তে অবস্থিত প্রাচীন 'প্রেয়াহ ভিহিয়ার' মন্দির ও চারপাশের জমি নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সাথে সীমান্ত উত্তেজনা দেখা দিয়েছে । রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বিরাজমান যুদ্ধাবস্থা মূলত সীমান্তবিরোধ নিয়ে ।
ইজরায়েল ও ফিলিস্তিন যুদ্ধও মূলত ছোট একটি ভূখণ্ডের মালিকানা দখলকে কেন্দ্র করেই শুরু এবং চলমান । আলজেরিয়া ও মরক্কোর মধ্যেও ভূমি নিয়ে বিরোধ চলমান। ইতোপিয়া ও সুদানের মধ্যে দুই দেশের সীমান্তবর্তী উর্বর ভূমি 'আল-ফাসাগা' নিয়ে সামরিক সংঘাত চলমান । সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যে তেল সমৃদ্ধ 'আবিয়েই' অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সীমান্ত উত্তেজনা রয়েছে ।
ভেনুজুয়েলা ও গায়না উভয়ই তেল সমৃদ্ধ 'এসেকুইবে' অঞ্চলটিকে নিজের বলে দাবি করায় সেখানে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান । নাফ নদী এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কাছাকাছি জলসীমা নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে প্রায়ই উত্তেজনা দেখা দেয় এবং গোলাগুলি চলে। সৌভাগ্যের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমানা নিয়ে বর্তমানে কোন বিরোধ নেই ।
এই দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জটিল স্থল ও জলসীমানা বিরোধ মূলত শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে পারস্পরিক সমঝোতা ও ঐতিহাসিক চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করেছেন । ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও সুনির্দিষ্টভাবে সীমানা চিহ্নিত করে আমাদের একটা পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র ছিল না ।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই দুই দেশের অভ্যন্তরে অন্য দেশের ভূখণ্ড বা ছিটমহল (enclaves) রয়ে গিয়েছিল । ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময় করে । বাংলাদেশ ভারতের অভ্যন্তরে থাকা নিজের ৫১টি ছিটমহল (৭,১১০ একর জমি) ভারতকে দিয়ে দেয় ।
বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা নিজের ১১১ টি ছিটমহল (১৭,১৬০ একর জমি) বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে । এর ফলে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ স্থায়ী নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার পায় । এবং এদের দীর্ঘদিনের পরিচয়হীন জীবনের অবসান ঘটে । এর সাথে ৬.১ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমানার স্থায়ী সমাধান হয় অর্থাৎ বাংলাদেশের মানচিত্রটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ।
বঙ্গোপসাগরে জলসীমা ও মহীসোপানের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশকের বিরোধও মীমাংসা করেন শেখ হাসিনা । ২০১৪ সালের ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরের বিতর্কিত ২৫,৬০২ বর্গ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৯,৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকার অধিকার বাংলাদেশ লাভ করে ।
এই দুইটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কোন রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছাড়াই আলোচনা ও আইনি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সীমান্ত বিরোধের স্থায়ীভাবে সমাপ্তি টানার কৃতিত্ব শেখ হাসিনার । একটা কথা মনে রাখতে হবে ভারত বাংলাদেশ পরস্পরের প্রতিবেশী, যা কোনদিনই পরিবর্তন করা যাবে না । অতএব সম্পর্কের যত টানাপোড়েনই থাকুক না কেন আলোচনা এবং কূটনৈতিক প্রয়াসের মাধ্যমেই সেগুলোর সমাধান করতে হবে ।
নির্বাচনের আগে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের "হুংকার" এবং বাংলাদেশের রাজনীতির আবহমান কালের ভারত বিরোধী "দিল্লি না ঢাকা" স্লোগান দিয়ে উভয় দেশে পরস্পর বিরোধী একটা বিশেষ শ্রেণী গোষ্ঠীর ভোট আদায় করা যাবে, কিন্তু প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না । ন্যায্যতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই কেবল দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান টানাপোড়েনগুলোর সমাধান আনতে পারে ।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অর্বাচীন বক্তব্য ( ২৬ লক্ষ ভারতীয় ! চিকেন নেক ! সেভেন সিস্টার্স ! চল্লিশ কোটি হাত দিয়ে কলকাতা দখল ! ৮ ঘন্টায় ঢাকা দখল ! বাঙালি খেদাও ! ) এ সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলবে । এতে উভয় দেশেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অর্থনৈতিক বিবেচনায় আমদানি নির্ভর ছোট অর্থনীতির দেশ হিসেবে ক্ষতির পাল্লাটা বাংলাদেশের দিকেই বেশি ভারী হবে ।