মামুনুর রশীদ মামুন:
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কংস নদীর পাড়ে এখন কেবল দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার। প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেলায় আর নদী শাসনের অবহেলায় মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে কাকৈরগড়া ইউনিয়নের ভাউরতলা, নগুয়া ও কুলঞ্জা গ্রামের অস্তিত্ব। গত কয়েকদিনে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে শত শত ঘরবাড়ি, ফসলি জমি আর স্বপ্নের বসতভিটা। সর্বস্বান্ত হয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে কয়েকশ পরিবার। নদীভাঙনের এই মহাদুর্যোগে দিশেহারা ভুক্তভোগী মানুষ এখন কেবল একটাই দাবি তুলছেন— "আমরা বাঁচতে চাই, আমাদের ভিটেমাটিটুকু রক্ষা করুন।"
গতকাল রবিবার (১২ জুলাই) দুপুরে কংস নদীর পাড়ে এক বিশাল মানববন্ধনে মিলিত হন নদী ভাঙনের শিকার হওয়া ভাউরতলা, নগুয়া ও কুলঞ্জা গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ। স্থানীয় পর্যায়ে এটি একটি বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি হলেও এর অন্তর্নিহিত বার্তাটি জাতীয় দুর্যোগের সমতুল্য। মানববন্ধনে বয়স্ক মানুষ থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর—সবাই উপস্থিত ছিলেন তীব্র ক্ষোভ ও চরম আতঙ্ক নিয়ে।
প্রশাসনের নীরবতায় বাড়ছে শঙ্কা: ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে কংস নদী ভাঙন চললেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। বর্ষা মৌসুম এলেই ভাঙন তীব্র হয়, আর ভাঙন শেষে প্রশাসনের আশ্বাসও যেন জলের তোড়ে ভেসে যায়। স্থানীয়রা বলছেন, "প্রতিবারই আমরা ভাঙনের কবলে পড়ি, সরকার আসে আশ্বাস দেয়, কিন্তু কার্যকর কোনো বাঁধ বা নদী শাসন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় না। আমরা কি এদেশের নাগরিক নই? কেন আমরা নিজেদের ভিটামাটি হারাচ্ছি?"
জননেতার কাছে আকুল আবেদন: মানববন্ধনে এলাকাবাসী স্থানীয় সাংসদ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তারা বলেন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বরাবরই মানবিক ও জনবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিত। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে তার জোরালো ভূমিকা ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে তদ্বির ছাড়া এলাকাবাসীর পক্ষে এই ভয়াবহ বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব। স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দও এতে সংহতি জানিয়ে দাবি করেন, এই তিন গ্রামকে বাঁচাতে হলে অনতিবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে নদী শাসনের কাজ শুরু করতে হবে। অন্যথায় অচিরেই মানচিত্র থেকে গ্রামগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি: সরকার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে নদী ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের দাবিগুলো হলো: ১. জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ: ভাঙন পয়েন্টগুলোতে তাৎক্ষণিক জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলে ভাঙন রোধ করা। ২. স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ: ভবিষ্যতে যেন নদী ভাঙনে আর কোনো পরিবার নিঃস্ব না হয়, সেজন্য স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ। ৩. পুনর্বাসন: যারা ইতিমধ্যে সর্বস্ব হারিয়েছে, তাদের জন্য সরকারিভাবে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
টনক নড়বে কি প্রশাসনের? মানববন্ধনে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, নদী ভাঙন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি জাতীয় ইস্যু। হাজার হাজার মানুষের এই কান্না যদি রাষ্ট্রের কর্ণকুহরে না পৌঁছায়, তবে মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য। সংশ্লিষ্ট মহলের উদাসীনতা ও অবহেলার দায় কে নেবে—এমন প্রশ্নই এখন সবার মুখে।
ভাউরতলাসহ দুর্গাপুরের নদীপারের মানুষ এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তারা মনে করছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই জনপদটি পুরোপুরি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে, যা হবে এক অপূরণীয় ক্ষতি।