খলিফা সাগর : নিজস্ব প্রতিবেদক পটুয়াখালী।
গ্রাম থেকে শুরু করে শহর, বাংলাদেশের যেকোন পথে ঘাটে এমন কি চায়ের দোকানে এখন দেখা যায় শিশু খাদ্য, লাচ্ছি, মাঠা, লাবাং, তরল দুধসহ অসংখ্য দুগ্ধজাত পণ্যের সারি।
নিত্য নতুন কোম্পানি, সাথে পুরনো ব্র্যান্ড গুলোর নিত্য নতুন আকর্ষণীয় মোড়ক—দেখলে মনে হয় এক স্বপ্নের খাদ্য বিপ্লব। কিন্তু বাস্তব কি তেমনই?
আমরা ভোক্তা হিসেবে অনেক সময় ভাবি, বিএসটিআই-এর সিল আছে মানেই পণ্যটি বিশুদ্ধ।
কিন্তু সেটাই কি যথেষ্ট প্রমাণ?
হাজারো পণ্যের মাঝে লুকিয়ে থাকে কিছু কৌশলগত প্রতারণা—যার একটি নীরব দিক হলো সাদা রঙের প্লাস্টিক বোতল। কেন দুধজাত পণ্যেই সাদা বোতল?
একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়—
যে সব কোমল পানীয়, ফলের জুস, পানির বোতল, এমনকি তেল পর্যন্ত—সবই স্বচ্ছ বোতলে বিক্রি।
কিন্তু দুধ, মাঠা, লাচ্ছি বা লাবাং? সবই সাদা বোতলে। যেন বাইরে থেকে দেখা না যায় ভেতরের রঙ, ঘনত্ব বা আসল অবস্থাটা।
প্রশ্ন হচ্ছে—এটা কি সত্যিই স্বাস্থ্যগত কারণ, নাকি অস্বচ্ছতার আড়ালে স্বচ্ছ ব্যবসা?
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও বাস্তব কৌশল:
বিদেশে কিছু ব্র্যান্ড স্বচ্ছ বোতলেই দুধজাত পণ্য বিক্রি করে। ব্যাখ্যা—দুধে ভিটামিন D ও B2 সূর্যের আলোয় কিছুটা ক্ষতি গ্রস্ত হতে পারে। তাই কিছু ক্ষেত্রে হালকা রঙিন বোতল ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে যে মাত্রায় সাদা অস্বচ্ছ বোতল ব্যবহার হয়, তা প্রাযুক্তিক নয়—বাণিজ্যিক কৌশল।
অনেক স্থানীয় ও মাঝারি কোম্পানি গরুর দুধ ছাড়াই বিভিন্ন কেমিকেল মিশ্রণ করে দুধের মতো তরল
তৈরি করে, যেটা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না। স্বচ্ছ বোতলে রাখলে সেটার রঙ, ঘনত্ব বা ফেনার পার্থক্য চোখে ভেসে আসবে বলে।
তাই সাদা বোতল তাদের জন্য নিরাপদ ঢাল, যাতে করে ভোক্তা না বুঝেই প্রতারণার শিকার হয়।
সরকারি তদারকির সীমাবদ্ধতা:
বিএসটিআই বা খাদ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্যাকেজিং-এর রঙ বা স্বচ্ছতা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে কোম্পানিগুলো সহজেই এই ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যাচ্ছে।
যুগের পর যুগ এই সাদা বোতলগুলোই হয়ে উঠেছে ভেজাল ঢাকার প্রতীক।
কিভাবে প্রতারিত হচ্ছে ক্রেতা?
“পাস্তুরিত দুধ” আসলে তৈরি হয় না আসল দুধ থেকে; বরং কেমিকেলের মিশ্রণেই তৈরি হয়।
* সাদা বোতল বা প্যাকেটের আড়ালে ওই দুধের গন্ধ, রঙ, জমাট বা আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়া আমরা কখনো দেখতে পাই না।
* শিশুখাদ্য হিসেবেও এসব পণ্য ব্যবহারে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি, তৈরি হয় ত্বকের অ্যালার্জি থেকে শুরু করে পেটের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা।
বিদেশি দুগ্ধজাত পন্যের বোতল যা স্বচ্ছ, দেখলে বোঝা যায় বাইরে থেকে ভিতরে কী আছে?
কেন বোতল সাদা / দুধের মতো দেখায়?
* রঙ এবং ভিজ্যুয়াল কিউ মানুষের মনকে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে — সাদা = কাঁচা/তাজা/দুধিক জিনিসের প্রতীক। বিক্রেতা এটাকে ব্যবহার করে ক্রেতার প্রথম ইম্প্রেশন সিল করে নেয়।
* আড়াল করা (opaque) প্যাকেজিং কিছু ক্ষেত্রে বৈধ কারণ: আলো ও ইউভির কারণে ভেতরের পণ্য খারাপ হতে পারে; তাই আলো থেকে রোধ করতে সলিড/রং করা বোতল দেওয়া হয়। একইভাবে টেকসইতা, ব্র্যান্ডিং ও প্রিন্ট সুবিধার জন্যও।
পাইপ/স্ট্র-ইন্টিগ্রেশন (পাইপ কেন দেয়?) সম্ভাব্য কারণগুলো:
১.স্যানিটারি ও কনভিনিয়েন্স: একক-সার্ভ আইটেমে স্ট্র লাগানো সুবিধাজনক—রাস্তার উপর খাওয়ার জন্য।২.কনজিউমার-এক্সপিরিয়েন্স: সরাসরি চুষে খাওয়াতে হলে ভোক্তা “রিয়েল-টাইম” স্বাদ পায় — বলে কোম্পানি চায় (একবার স্বাদ নিলে আবার কেনার প্রবণতা বাড়ে)।
৩.প্রোমোশানাল/ব্র্যান্ডিং:স্ট্র ফ্রি-অফার করলে ক্রেতার কাছে উপহারবোধ, সুবিধাবোধ সৃষ্টি হয়। ৪.টাম্পার-ইভিডেন্ট ফিচার: কিছু ক্ষেত্রে সিল করা বোতল + স্ট্র একসাথে দেওয়া হলে বোতল খোলা না থাকলে বোতল ছুঁড়ে ফেললেই বোঝা যায়—কিছু প্যাকেজিংয়ে এটাও লক্ষ্য করা যায়।
- এটা কি আড়াল করার কৌশল হ্যাঁ—অংশটাও আছে। প্যাকেজিং ডিজাইন করে মানুষের নিস্ক্রিয় সিগন্যালে প্রভাব রাখা যায়: রঙ, টেক্সচার, স্ট্রের উপস্থিতি — সব মিলিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে ভোক্তাকে প্রভাবিত করে। তবে সব কোম্পানি অসাধু চক্রের সাথে জড়িত নয়।
বাস্তব কারণ (উদাহরণ স্বরূপ) আলোর ক্ষতি, অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বিক্রির সুবিধা) থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ থাকা শ্রেয়।
যদি আপনি নিশ্চিত হতে চান — কী করনীয় (সতর্কতা মূলক টিপস)
১. লেবেল ভালো করে পড়ুন: উপাদান, উৎপাদন তারিখ, ব্যাচ নম্বর, মেয়াদ, সংরক্ষণ শর্ত (ইংরেজিতে/বাংলা) দেখে নিন।
২. BSTI/অন্য সার্টিফিকেট দেখুন: বাংলাদেশে অনুমোদিত মানচিহ্ন দেখুন। (আপনি পূর্বে BSTI উল্লেখ করেছিলেন — এটা ভালো উপায়)।
৩. দোকান ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালো করে জানুন।
৪. প্যাকে চাপ/সিল পরীক্ষা করুন: সিল খোলা/টুটে থাকলে ক্রয় থেকে বিরত থাকুন।
৫. রঙ/গন্ধ/স্বাদ যাচাই করুন।
৬৷ শেক টেস্ট: যদি বোতলটি সুরক্ষিতভাবে খোলা যায়, নরমভাবে ঝাঁকান — যদি অস্বাভাবিকভাবে আলাদা ফরমেশন (মোটামুটি অসম) থাকে, সাবধান হন।
৭. ট্রায়ালের জন্য ছোট প্যাক নিন: প্রথমবার নতুন কোম্পানি হলে ছোট সাইজ নিয়ে দেখুন।
৮. গ্রাহকসেবা/কোম্পানিকে যোগাযোগ করুন: প্রশ্ন করুন—উৎপাদন পদ্ধতি, পাস্তুরাইজেশন/ইউএইচটি ইত্যাদি সম্পর্কে। প্রতিউত্তরে যদি অস্পষ্টতা থাকে, সেটা ক্রয় থেকে বিরত থাকুন।
৯. কমিউনিটি/সোশ্যাল রিভিউ দেখুন: অন্য ভোক্তারা কী বলছে—অভিজ্ঞতা কাজে লাগান।
১০. প্রয়োজনে ল্যাব টেস্ট: যদি সিরিয়াস সন্দেহ (স্বাস্থ্যঝুঁকি) মনে হয়, লোকাল ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ বা পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠানো যেতে পারে।
কী হতে পারে সমাধান?
১. স্বচ্ছ বোতল বাধ্যতামূলক করা:
দুধজাত সব তরল পণ্যে অন্তত ৭০% স্বচ্ছ অংশ থাকা, যাতে ভোক্তা বোতলের ভেতর দেখতে পারে।
২. প্রত্যেক ব্যাচের ল্যাব রিপোর্ট অনলাইনে প্রকাশ:
কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করা হোক প্রতিটি ব্যাচের পরীক্ষার ফলাফল কিউআর কোডে প্রদর্শন করতে।
৩. জনসচেতনতা বৃদ্ধি:
মিডিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোক্তা শিক্ষা চালু করা দরকার—যাতে মানুষ পণ্যের মোড়ক, গন্ধ, ঘনত্ব, মেয়াদ ইত্যাদি যাচাই করতে শেখে।
৪. লাইসেন্স নবায়নের সময় প্যাকেজ রিভিউ:
বিএসটিআই ও খাদ্য অধিদপ্তরকে প্যাকেজ ডিজাইন ও স্বচ্ছতা পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৫. নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য স্বতন্ত্র মনিটরিং সেল:
বিশেষত শিশু খাদ্য ও দুধজাত পণ্য নিয়ে একটি “ফুড ইন্টিগ্রিটি ইউনিট” গঠন করা দরকার।
একটা সাদা বোতল যেন কেবল প্লাস্টিক না হয়—হয়ে না ওঠে, অস্বচ্ছতার প্রতীক।
স্বচ্ছ বোতল মানে শুধু ভেতর দেখা নয়, বরং দেশের খাদ্যনীতির ভেতরটাও পরিষ্কার দেখা।
যদি আমরা এখনই প্রশ্ন না তুলি, তাহলে একদিন “বিশুদ্ধ” শব্দটাই হারিয়ে যাবে আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি থেকে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।