মামুনুর রশীদ মামুন | ময়মনসিংহঃ

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ময়মনসিংহ মহানগর ও আশপাশের এলাকায় ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের অস্বাভাবিক সংকটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় পরিবহন চালক ও সাধারণ ভোক্তাদের দাবি—কিছু ফিলিং স্টেশনের মালিক কালোবাজারি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিয়মবহির্ভূতভাবে বোতল ও ট্যাংকিতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিক্রি করছেন। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।

শুক্রবার (৬ মার্চ) বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে সরেজমিনে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চুরখাই বাজার এলাকায় অবস্থিত এমএসএম ফিলিং স্টেশন-এ এমন অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। স্থানীয়রা জানান,স্টেশনটিতে নিয়মিত যানবাহনে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের পরিবর্তে বোতল ও ট্যাংকিতে করে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিক্রি করা হচ্ছে। পরে এসব জ্বালানি কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাস্থলে ধারণ করা প্রায় ১২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ভিডিওতে বোতল ও ট্যাংকিতে জ্বালানি নেওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী। ভিডিওটি ঘিরে এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ভোগান্তিতে চালক ও সাধারণ মানুষ: স্থানীয় পরিবহন চালকদের অভিযোগ,গত কয়েকদিন ধরে মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পাম্পে জ্বালানি নেই বলে জানানো হচ্ছে,আবার কোথাও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

একজন মোটরসাইকেল চালক বলেন,“আমরা সাধারণ চালকরা তেল পাচ্ছি না। অথচ বোতলে করে অনেক তেল নেওয়া হচ্ছে। এতে সন্দেহ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।” আরেকজন পরিবহন শ্রমিক বলেন,“যদি পাম্প থেকেই এভাবে বোতলে তেল বিক্রি হয়,তাহলে বাজারে সংকট তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।”

মালিকের বক্তব্য: এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমএসএম ফিলিং স্টেশনের মালিক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা শফিক উল্লাহ মুঠোফোনে বলেন,“আমার এখানে যতক্ষণ তেল আছে,ততক্ষণ বিক্রি হবে। আপনি লিখলে লিখতে পারেন, রেকর্ড করলেও সমস্যা নেই।” তার এই বক্তব্যে– স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময় ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নিরাপত্তা ও আইনগত প্রশ্ন: জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন,অনুমোদিত ফিলিং স্টেশন থেকে বোতল বা ট্যাংকিতে জ্বালানি বিক্রি করা হলে তা অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পাশাপাশি এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগও সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে,জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না হলে বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে,যার প্রভাব সরাসরি পরিবহন খাত ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে সচেতন মহল বলছে,যদি সত্যিই কোনো চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে থাকে,তবে তা দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও তীব্র হবে। তদন্তের দাবি: স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের মতে,জ্বালানি সরবরাহে অনিয়ম থাকলে তা শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়; এটি বৃহত্তর অর্থনীতি ও জনস্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। বিশ্লেষকদের মতে,সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে সেটিকে পুঁজি করে কিছু অসাধু চক্র সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই স্বচ্ছ তদন্ত ও কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এখন সময়ের দাবি।