মামুনুর রশীদ মামুন,ময়মনসিংহ প্রতিনিধি :

ময়মনসিংহের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অফিসে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন,মালিকানা পরিবর্তন,ফিটনেস ও বিভিন্ন যানবাহনসংক্রান্ত সেবা নিতে আসা মানুষদের অভিযোগ—দালাল ছাড়া যেন কোনো কাজই হচ্ছে না।

বরং নির্ধারিত সরকারি ফি জমা দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলেও নানা অজুহাতে হয়রানি করা হচ্ছে,আর দালালের মাধ্যমে গেলে সহজেই সম্পন্ন হচ্ছে সব কাজ।সম্প্রতি এসব অনিয়ম, হয়রানি ও দালাল সিন্ডিকেটের তৎপরতা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বরং ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগ প্রকাশের পর দালাল চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অফিসের ভেতরের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে তারা এখন আগের চেয়েও প্রকাশ্যে তৎপরতা চালাচ্ছে। অভিযোগ প্রকাশ,কিন্তু নেই কার্যকর ব্যবস্থা! স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ময়মনসিংহ বিআরটিএ অফিসে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।

বিভিন্ন সময় অভিযোগ ওঠা, সংবাদ প্রকাশ এবং প্রশাসনের আশ্বাসের পরও বাস্তবে দালাল চক্র নির্মূলে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সেই আশ্বাসের পরও এখন পর্যন্ত কোনো অভিযান,তদন্তের ফলাফল কিংবা দালালদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। ফলে দালাল চক্রের সদস্যরা আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, “অভিযোগ করলে লাভ হয় না। উল্টো পরে গেলে কাজ আরও আটকে দেওয়া হয়। তাই অনেকে বাধ্য হয়েই দালালের শরণাপন্ন হন।”

দালাল ছাড়া আবেদন করলেই শুরু হয় হয়রানি! সরেজমিন অনুসন্ধান ও একাধিক আবেদনকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেউ যদি সরাসরি বিআরটিএ অফিসে গিয়ে নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করতে চান, তাহলে তাকে নানাভাবে হয়রানির মুখে পড়তে হয়। কখনো কাগজপত্রে সামান্য ভুল বা ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন গ্রহণ করা হয় না।

কখনো আবার একই কাগজ বারবার সংশোধন করতে বলা হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে অনেক আবেদনকারী অভিযোগ করেছেন, যথাযথ প্রস্তুতি ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরও অযৌক্তিকভাবে ফেল দেখানো হয়। পরে দালালের মাধ্যমে গেলে সহজেই পাস দেখিয়ে লাইসেন্স দেওয়া হয়।

একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ,সরকারি নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পরও তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা দাবি করা হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। একজন আবেদনকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমি নিয়ম মেনে আবেদন করেছিলাম।

কয়েকবার অফিসে গিয়েও কাজ হয়নি। পরে এক দালাল এসে বলল, ১০ হাজার টাকা দিলে সব হয়ে যাবে। এরপর খুব দ্রুতই আমার কাজ হয়ে যায়।”অফিসের ভেতরেই দালালদের অবাধ বিচরণ! অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিআরটিএ অফিস চত্বরে এবং ভবনের ভেতরে দালালদের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। তারা আবেদনকারীদের ঘিরে ধরে দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।

শুধু অফিসের বাইরে নয়, অনেক দালালকে সরাসরি বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু দালাল নিয়মিতভাবে অফিস কক্ষে ঢুকে সরকারি নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে, কম্পিউটারে কাজ করে,এমনকি আবেদনপত্র, যাচাই-বাছাইয়ের মতো কাজেও সম্পৃক্ত থাকে।

তাদের আচরণ ও উপস্থিতি দেখে অনেক সময় সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারেন না—তারা আসলে সরকারি কর্মকর্তা নাকি অফিস বহির্ভূত কোনো ব্যক্তি। সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন,যদি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দালালদের প্রশ্রয় না দেন, তাহলে তারা কীভাবে নির্বিঘ্নে অফিস কক্ষে প্রবেশ করে সরকারি নথিপত্রে হাত দেওয়ার সাহস পায়?

স্থানীয় এক ভুক্তভোগী বলেন,“বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, দালালরাই যেন অফিস চালাচ্ছে। কোন কক্ষে যেতে হবে, কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কত টাকা লাগবে—সবকিছু তারাই ঠিক করে দেয়।” অভিযোগের কেন্দ্রে মোটরযান পরিদর্শক! অনুসন্ধানে উঠে এসেছে,এই দালাল সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট অফিসের মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবর।

অভিযোগ রয়েছে, তার কক্ষেই দালালদের নিয়মিত আনাগোনা রয়েছে। অনেক সময় তাদের সরকারি নথিপত্রে প্রবেশ ও ফাইল নিয়ে কাজ করার সুযোগও দেওয়া হয়। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জহির উদ্দিন বাবর বলেন,“দালালদের সরকারি নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটির বিষয়টি দুঃখজনক। বিষয়টি রোধে আমার কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।” তবে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি,এমন আশ্বাস আগেও দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কক্ষে কোনো দৃশ্যমান সিসিটিভি স্থাপন বা দালালদের প্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। সহকারী পরিচালকের আশ্বাস,বাস্তবে নেই অগ্রগতি! বিআরটিএ অফিসের সহকারী পরিচালক (এডি) আনিসুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে,সেই আশ্বাসের পরও বাস্তবে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।

বরং ভুক্তভোগীদের দাবি,আগের মতোই দালালদের দৌরাত্ম্য অব্যাহত রয়েছে। অফিসের ভেতরে-বাইরে তাদের উপস্থিতি, আবেদনকারীদের সঙ্গে প্রকাশ্যে লেনদেন এবং কর্মকর্তাদের কক্ষে যাতায়াত—সবকিছুই এখনও আগের মতো চলছে। চিহ্নিত কয়েক দালালের নাম উঠে এসেছে-

অনুসন্ধানে স্থানীয়ভাবে পরিচিত কয়েকজন কথিত দালালের নামও উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—মোফাজ্জল, হীরা, শান্ত, কামাল, খোকন, রিপন, ভুট্টো, শাহ কামাল, সেলিম ও তপনসহ আরও কয়েকজন। অভিযোগ রয়েছে, তারা “হয়রানিমুক্ত সেবা” দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, আদায়কৃত টাকার একটি অংশ ‘অফিস খরচ’ নামে সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছে এখন পর্যন্ত এসব বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। জেলা প্রশাসনের আশ্বাসের পরও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই: এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) এবং ড্রাইভিং কম্পিটেন্সি টেস্ট কমিটি (ডিসিটিসি)-এর সভাপতি আসাদুজ্জামান বলেন,“বিষয়টি আমাদের নলেজে না থাকলেও অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যখন একাধিক গণমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে কথা বলেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে পরিচিত—তখনও কেন কার্যকর তদন্ত বা অভিযানে দেখা যায়নি?

সচেতন মহলের মতে, শুধু আশ্বাস দিয়ে আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজন হলে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

সচেতন মহলের দাবি: এবার দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন

স্থানীয় সচেতন নাগরিক, সেবাপ্রত্যাশী ও ভুক্তভোগীদের মতে, বিআরটিএ অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই দালাল সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাদের দাবি—

বিআরটিএ অফিসে অবিলম্বে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে অফিস কক্ষগুলোতে কার্যকর সিসিটিভি স্থাপন ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।দালালদের প্রবেশ বন্ধে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে-অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ গ্রহণে পৃথক হটলাইন বা অভিযোগ বক্স চালু করতে হবে-জেলা প্রশাসন,দুদক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যৌথ তদন্ত প্রয়োজন-সচেতন মহলের ভাষ্য,“আরও একটি আশ্বাস নয়, এবার প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। অন্যথায় বিআরটিএ অফিসে দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না,আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও কমবে না।”