মামুনুর রশিদ মামুন-ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি :

 

ময়মনসিংহ শহরের নাসিরাবাদ এলাকার লাইসেন্সধারী দেশি ও বিদেশি মদের দোকান ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে পারমিট ছাড়া মদ বিক্রির অভিযোগ থাকলেও,কার্যকর কোনো তদারকি চোখে পড়ছে না।

অভিযোগ উঠেছে, লাইসেন্সধারী দেশি মদের দোকান থেকে কোনো পারমিট ছাড়াই প্রকাশ্যে মদ বিক্রি হচ্ছে। প্রতি লিটার দেশি মদ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার টাকায়। স্থানীয়দের দাবি,শুধু শহরেই নয়-ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই অবৈধ বাণিজ্য।

আর এসবের পেছনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে ‘মাসোয়ারা’ নেওয়ার অভিযোগ এখন জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য,নাসিরাবাদের একাধিক দোকানে কোনো ধরনের অনুমতিপত্র বা পারমিট ছাড়াই ক্রেতারা সহজে মদ কিনতে পারছেন। আইন অনুযায়ী,লাইসেন্সধারী দোকান থেকেও পারমিট ছাড়া মদ বিক্রি বেআইনি। কিন্তু বাস্তবে সেই আইনের কোনো প্রয়োগ নেই।

অভিযোগ রয়েছে, দোকানভেদে নির্দিষ্ট দামে ‘ম্যানেজ’ করা হলেই মিলছে দেশি মদ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট একটি মদের দোকানের ম্যানেজার পিংকু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমাদের দোকানে আইন অনুযায়ীই বিক্রি হয়। পারমিট ছাড়া কাউকে মদ দেওয়া হয় না।” তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও স্থানীয়দের বক্তব্য তার এ দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মুক্তাগাছায় ‘বার বসিয়ে’ মদ খাওয়ানোর অভিযোগ! শুধু ময়মনসিংহ শহর নয়,পাশের মুক্তাগাছা উপজেলায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে অভিযোগ উঠেছে। একাধিক গণমাধ্যমকর্মীর অনুসন্ধানী টিম সম্প্রতি মুক্তাগাছার কয়েকটি স্থানে গিয়ে দেখতে পায়,প্রকাশ্যে ‘বার’ বসিয়ে দেশি মদ খাওয়ানো হচ্ছে। সেখানে কোনো পারমিট বা পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, টাকা দিলেই লিটারপ্রতি প্রায় ২ হাজার টাকায় মিলছে দেশি মদ এবং চাইলে সেখানেই বসে পান করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি,এ ব্যবসা দিনের পর দিন প্রকাশ্যে চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান অভিযান নেই। বরং এলাকাজুড়ে জনশ্রুতি রয়েছে—নিয়মিত অর্থ লেনদেনের মাধ্যমেই এসব ব্যবসা টিকে আছে।
পরাণগঞ্জে ‘মাসোয়ারা’র অডিও ভাইরাল! ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পরাণগঞ্জ এলাকায় চোলাই মদের কারখানা ঘিরেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে,সেখানকার অবৈধ মদ ব্যবসা থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করা হয়। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অডিওটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি,তবে বিষয়টি তদন্তের দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। এ অবস্থায় গত ৩১ মার্চ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়,ময়মনসিংহের পরিদর্শক খন্দকার ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে কোতোয়ালি মডেল থানার আওতাধীন আব্দুল্লাহপুর (পরাণগঞ্জ) রবিদাসপাড়ায় একটি মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মনোহর রবিদাস (৫২) নামে এক ব্যক্তিকে ৮ লিটার চোলাই মদসহ আটক দেখানো হয়। পরে উপপরিদর্শক আজগর আলী বাদী হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ,একই ঘটনায় জড়িত হিসেবে পরিচিত জীবন নামের আরেক ব্যক্তিকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, “যাদের ধরা হয়,তারা হয় ছোটখাটো বাহক। আর যাদের নাম এলাকায় সবাই জানে, তারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।” এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।গৌরীপুর,ভালুকা,গরুহাট,ধলা—একই অভিযোগ!
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ এলাকার চোলাই মদের কারখানা থেকেও নিয়মিত মাসোয়ারা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি,এক ব্যবসায়ী হঠাৎ অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দিলে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। অভিযোগ উঠেছে,সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে পুনরায় অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন।
শুধু শ্যামগঞ্জ নয়,গৌরীপুর পৌর এলাকার গরুহাটসংলগ্ন মদপল্লী,ভালুকা নামের আরেক মদপল্লী,ত্রিশাল উপজেলার ধলা এলাকার মোছারপাড়া এবং ময়মনসিংহ শহরের কথিত ‘সুরমা’ ও ‘সুবর্ণা’ মাদক স্পট থেকেও নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য,এসব স্থানে প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও তা অধিকাংশ সময়ই ‘আনুষ্ঠানিক’ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। ফলে অবৈধ মদ ব্যবসা বন্ধ না হয়ে বরং আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
‘মিথ্যা মামলা,টাকা ও স্বর্ণ লুটের’ অভিযোগ! ফুলপুর উপজেলার পলাশকান্দী গ্রামের লাল সাধু নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন,তিনি নিয়মিত অর্থ না দেওয়ায় তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নান্দাইল উপজেলার জুলেখা নামের এক নারী। তাদের অভিযোগ,কথিত অভিযানের নামে বাড়িতে গিয়ে নগদ টাকা,গরু বিক্রির অর্থ এবং স্বর্ণালংকার নিয়ে আসা হয়েছে। এমনকি ভয়ভীতি দেখিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো লিখিত তদন্ত হয়েছে কি না,তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রশ্ন জনমনে: দায়িত্বশীল সংস্থার বিরুদ্ধেই কেন এত অভিযোগ? মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মূল দায়িত্ব হলো অবৈধ মাদক উৎপাদন,বিক্রি ও পরিবহন বন্ধ করা। কিন্তু সেই সংস্থার কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি অবৈধ মদ ব্যবসা থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে জনসাধারণের আস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—এ প্রশ্ন এখন ময়মনসিংহজুড়ে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি,শুধু ছোটখাটো অভিযানে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন অবৈধ মদ ব্যবসার মূল হোতাদের চিহ্নিত করা,অর্থের বিনিময়ে দায় এড়ানোর সুযোগ বন্ধ করা এবং যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা। পুলিশ সুপারের বক্তব্য: এ বিষয়ে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন,“মাদক ব্যবসা, মাদকের গডফাদার,অনিয়ম ও অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেখানেই অভিযোগ পাওয়া যাবে,সেখানেই তদন্ত হবে।”
তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ: ময়মনসিংহে অবৈধ মদ ব্যবসা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে প্রকাশ্যে পারমিট ছাড়া মদ বিক্রি,বার বসিয়ে পান করানো,আর সেই সঙ্গে দায়িত্বশীল সংস্থার কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে—তা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়,রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিরও প্রশ্ন। সরকার যদি সত্যিই মাদকবিরোধী অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়,তাহলে এ অভিযোগ গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি অবৈধ মদ ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে,তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।