মামুনুর রশীদ মামুন, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি :

ময়মনসিংহ শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলা মাদক বাণিজ্যকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন কুখ্যাত মাদক স্পট থেকে নিয়মিত “মাসোয়ারা” আদায় করছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু সদস্য। অভিযোগ রয়েছে—সাপ্তাহিক ও মাসিক নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে বহাল তবিয়তে চলছে গাঁজা, ইয়াবা ও দেশি-বিদেশি মদের রমরমা ব্যবসা।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান কিংবা দু-একটি মামলা হলেও প্রকৃতপক্ষে বন্ধ হচ্ছে না কোনো মাদক স্পট। বরং অভিযানের আড়ালেই চলছে অর্থ লেনদেনের এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে,ময়মনসিংহ নগরী থেকে শুরু করে ত্রিশাল,গৌরীপুর, ফুলবাড়িয়া, নান্দাইল, হালুয়াঘাট ও তারাকান্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

শহরের ব্রীজ মোড় এলাকার আলোচিত “সুরমা স্পট” থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে “মাদক সম্রাজ্ঞী” হিসেবে পরিচিত হামের স্পট থেকে নেওয়া হয় প্রায় ৬ হাজার টাকা। নগরীর ভৈরব রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় সুবর্না গ্রেপ্তার হলেও বন্ধ হয়নি তার নিয়ন্ত্রিত মাদক ব্যবসা—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। ওই এলাকা থেকে মাসোয়ারার পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।

একই এলাকার গাঁজা ব্যবসায়ী জহিরুল সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। হালুয়াঘাটের ধারা বাজারের মদ ব্যবসায়ী এতিনের কাছ থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা, ফুলবাড়িয়ার কথিত গাঁজা ও ইয়াবা ব্যবসায়ী জীবন বাবুর কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

গৌরীপুর ও ভালুকা সংলগ্ন এলাকার মদপল্লী থেকে মাসে প্রায় ২৮ হাজার টাকা এবং গরুরহাট এলাকার আরেকটি মদপল্লী থেকে ১০ হাজার টাকা আদায়ের তথ্য দিয়েছেন স্থানীয়রা। ত্রিশালের ধলা বাজারের মেতরপল্লীতে মদের ব্যবসার সমন্বয়কারী হিসেবে পরিচিত লিটন জেলা কার্যালয়কে ২২ হাজার এবং গোয়েন্দা শাখাকে ১৮ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এছাড়া দাপুনিয়া এলাকার হাফিজুল সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা, বাড়েরা এলাকার আনু ৫ হাজার টাকা এবং খানা পাড়া এলাকার মোখলেস ১২ হাজার টাকা মাসোয়ারা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্যামগঞ্জ বাজারের আলোচিত গাঁজা ব্যবসায়ী আখালি ১৫ হাজার টাকা এবং একই এলাকার মদ ব্যবসায়ী স্বাধীন ১৫ হাজার টাকা নিয়মিত দিচ্ছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

নান্দাইলের কথিত গাঁজা ও ইয়াবা ব্যবসায়ী রঙ্গুর কাছ থেকে সপ্তাহে ১৫ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পরানগঞ্জ এলাকার মদ ব্যবসা কেন্দ্রিক মাসোয়ারার পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার টাকা বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তারাকান্দা বাজারের পশ্চিম পাশে গাঁজা ব্যবসায়ী সোহেলের কাছ থেকেও প্রায় ২০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, এসব মাসোয়ারা আদায়ে সরাসরি জড়িত রয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা ও গোয়েন্দা শাখার কয়েকজন সদস্য। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসআই আজগর,এএসআই মাইন উদ্দিন ও এএসআই মাহাবুবের নাম বারবার উঠে আসছে। তবে এসব অর্থ আদায় সংশ্লিষ্ট অফিস প্রধানের অলিখিত নির্দেশনায় হয়ে থাকে বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ—মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের কাছ থেকেই সুবিধা নেওয়ার কারণে তরুণ সমাজ ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়ছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলে কিশোর-তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পরিবারে পরিবারে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা, বাড়ছে চুরি,ছিনতাই ও সহিংস অপরাধ। একাধিক সচেতন নাগরিক বলেন, “যেসব জায়গা প্রশাসনের নজরদারিতে থাকার কথা, সেসব জায়গাতেই দিনের পর দিন প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে।

সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারে না। যারা অভিযোগ করে, তারাই পরে হয়রানির শিকার হয়।” এদিকে অভিযোগগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। জনশ্রুতি রয়েছে, অভিযুক্তদের কেউ কেউ ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছেন। এমনকি ডিজি অফিস পর্যন্ত তাদের “অদৃশ্য ক্ষমতার উৎস” রয়েছে বলেও আলোচনা রয়েছে স্থানীয় মহলে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে যদি দুর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। শুধু বাহক বা ছোটখাটো বিক্রেতাদের আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং মাদক সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। তারা আরও বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সরকারের মাদকবিরোধী অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।