মামুনুর রশীদ মামুন:
ময়মনসিংহে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) সার্কেলে সহকারী প্রকৌশলী কাজী আমান উল্লাহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনিয়ম ও দুর্নীতির এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সরকারি গাড়ি অপব্যবহার, ভুয়া টিএ (ভ্রমণ ভাতা) বিল দাখিল, প্রকল্পের ‘পজিটিভ রিপোর্ট’ প্রদানের বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণ এবং দাপ্তরিক সময়ের চরম অবহেলাসহ তার বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। মাঠপর্যায়ে কাজের চেয়ে দাপ্তরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ এবং আর্থিক অনিয়মেই বেশি মনোযোগী এই কর্মকর্তা। তার এই কর্মকাণ্ডে দপ্তরের কাজের মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
অফিসে দেরিতে উপস্থিতি ও ক্ষমতার দাপট: সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, দাপ্তরিক কাজের সময় সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সহকারী প্রকৌশলী কাজী আমান উল্লাহ নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেন না। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত সময়মতো অফিসে উপস্থিত হন না। এছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলী পদের কোনো কর্মকর্তার জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ নেই। অথচ কাজী আমান উল্লাহ নিয়মিতভাবে ময়মনসিংহ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বরাদ্দকৃত গাড়িটি ব্যবহার করছেন। বিভিন্ন মিটিং ও দাপ্তরিক কাজের অজুহাত দেখিয়ে তিনি প্রভাব খাটিয়ে এই গাড়ি ব্যবহার করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ রওশন আলম বলেন, “গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি আমার অনুপস্থিতিতে বা আমার অনুমতিক্রমে তিনি করে থাকেন।” তবে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা ও দাপ্তরিক সময়ের অবহেলা সম্পর্কে কোনো সদুত্তর মেলেনি।
পরিদর্শনের নামে ভুয়া বিল ও ঘুষ বাণিজ্য: অভিযোগ রয়েছে, সরকারি প্রকল্পের সঠিক মান যাচাইয়ের দায়িত্ব আমান উল্লাহর ওপর থাকলেও তিনি উপজেলা পর্যায়ের প্রকল্পগুলোতে সশরীরে উপস্থিত হন না। অথচ সরকারি নথিতে নিয়মিত প্রকল্প পরিদর্শনের ভুয়া তথ্য দিয়ে তিনি টিএ বিলের টাকা আত্মসাৎ করছেন। প্রকল্পের কাজ নিম্নমানের হলেও কেবল ঘুষের বিনিময়ে ঠিকাদারদের পজিটিভ রিপোর্ট প্রদান করছেন তিনি। এতে সরকারের কয়েক কোটি টাকার প্রকল্পগুলো দীর্ঘস্থায়ী না হয়ে চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অতীত রেকর্ড ও দাপ্তরিক অস্থিরতা: এর আগে কেন্দুয়া ও দুর্গাপুর কর্মস্থলে থাকাকালীন সময়েও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীরা জানান, কর্মক্ষেত্রে সঠিক সময়ে অনুপস্থিত থাকা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের বিষয়টি তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও কর্মস্থলের পরিবেশ বজায় রাখতে তার ভূমিকা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি: সহকারী প্রকৌশলী কাজী আমান উল্লাহর কাছে এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সরাসরি উত্তর না দিয়ে দায়সারাভাবে বলেন, “আপনারা অফিসিয়াল কাগজপত্রগুলো দেখুন অথবা সরাসরি অফিসে এসে সামনা-সামনি কথা বলুন।” তবে প্রকল্প পরিদর্শন না করে পজিটিভ রিপোর্ট দেওয়া এবং ভুয়া টিএ বিলের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ রওশন আলম বলেন, “তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো যদি সুনির্দিষ্ট আকারে আমাকে অবগত করা হয়, তবে বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে সচেতন মহল মনে করছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কেন এই অনিয়ম চলল—তা খতিয়ে দেখা জরুরি। শুধু অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে দপ্তরের অভ্যন্তরীণ অডিট ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা দরকার। জনস্বার্থ রক্ষায় এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধে মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
Reporter Name 















