
নিজস্ব প্রতিবেদক,ময়মনসিংহঃ
ময়মনসিংহ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) কার্যালয়ের হিসাব রক্ষক এম এ কবিরের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠে আসছে। প্রায় ৫ বছরেরও বেশি সময় একই পদে বহাল থেকে তিনি নানামুখী অনিয়ম,দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি এবং ঘুষ–বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে একাধিক ভুক্তভোগী কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট দফতরের অভ্যন্তরীণ সূত্রে। বদলির সরকারিক নির্দেশনা অমান্য—ঘুষে রক্ষা পেলেন এম এ কবির? সারা দেশে সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব রক্ষক পদে কর্মরতদের ব্যাপক বদলি করা হলেও,অভিযোগ রয়েছে—ময়মনসিংহের হিসাব রক্ষক এম এ কবির উচ্চ পর্যায়ে তদবির,নগদ অর্থ–লেনদেন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবহার করে নিজের বদলিকে ঠেকিয়ে দেন। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী একই দফতরে সর্বোচ্চ তিন বছর থাকার বিধান রয়েছে,সেখানে তিনি পাঁচ বছর ধরে একই স্থানে থেকে যাচ্ছেন নির্দ্বিধায়। ডিএনসির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন—“বদলির খসড়া তালিকায় তার নাম ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ‘ব্যবস্থায়’ নামটি বাদ পড়ে যায়।” এই অভিযোগ এম এ কবির অস্বীকার করলেও কর্মচারীদের মতে—এটি ‘গোপন রহস্য’ নয়; বরং ডিএনসি কার্যালয়জুড়ে এটি ‘খোলা গোপন’ তথ্য। সরকারি মালামাল ক্রয়ে ভুয়া বিল–ভাউচার! অভিযোগ রয়েছে—স্টেশননারি,এসি,প্রসেসিং ম্যাটেরিয়ালসহ বিভিন্ন অফিস সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে এম এ কবির ভুয়া বিল–ভাউচার সৃষ্টি করে লাখো টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কোনো মালামাল সরবরাহ না করেও কাগজে–কলমে বিল পাস করা,একই মালামাল বারবার ক্রয় দেখানো,অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে বিল অনুমোদন করানো—এসব অভিযোগ স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। এই বিষয়ে কথা বলতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন—
“আমরা দেখেছি বিল–ভাউচার তৈরির আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে যায় কোন দোকান থেকে কেনা হবে এবং কত টাকার বিল হবে। বাস্তবে তার সঙ্গে মিল থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই মালামাল পড়ে না অফিসে!” টিএ বিলের ২০% কমিশন বাণিজ্য—কমিশন না দিলে বিল আটকে থাকে বছরের পর বছর! একাধিক ভুক্তভোগী কর্মচারী অভিযোগ করেন,এম এ কবির টিএ (ট্রাভেল অ্যালাউন্স) বিল পাসের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে ২০% কমিশন দাবি করেন। “কমিশন না দিলে বিল পাস হবে না”— এমন অবস্থায় থাকা কর্মীরা বলছেন, অনেকের টিএ বিল বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর আটকে রয়েছে,শুধু কমিশন না দেওয়ার কারণে। একজন কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—“বিল পাস করা তার দায়িত্ব। কিন্তু এখানে দায়িত্ব নয়,হয়ে গেছে বাণিজ্য। টাকা না দিলে ফাইল নড়বেই না।” ভুক্তভোগীরা ভীত,তবু চায় মুক্তিঃ ডিএনসি ময়মনসিংহ কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—“আমরা ভয় পাই। কথা বললে বদলির ভয়,হুমকি—বিভিন্ন ভয়–ভীতি থাকে। কিন্তু আর পারছি না,এই অনিয়ম চলতে থাকলে অফিস ধ্বংস হয়ে যাবে।” তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন—“দীর্ঘদিনের এই দুর্নীতি না থামালে সাধারণ কর্মচারী থেকে শুরু করে গোটা দফতরই একসময় অকেজো হয়ে পড়বে।” অভিযোগ অস্বীকার এম এ কবিরেরঃ অভিযুক্ত হিসাব রক্ষক এম এ কবির তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন—“এসব ভিত্তিহীন। আমার বিরুদ্ধে কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না। আমি নিয়ম মেনেই কাজ করি।”
সচেতন মহলের দাবি—নিরপেক্ষ তদন্ত ও অবিলম্বে ব্যবস্থা। ময়মনসিংহের সচেতন মহল বলছে—ডিএনসির মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন–প্রয়োগকারী সংস্থায় এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম,ঘুষ–বাণিজ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাদের দাবি—১.অভিযোগ গুলো তদন্তে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। ২.বদলি–বিধি লঙ্ঘনের কারণ তদন্ত করা হোক। ৩.মালামাল ক্রয়ের ভুয়া বিল–ভাউচার পরীক্ষা করা হোক। ৪.টিএ বিল বাণিজ্যে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাঃ মাদকবিরোধী সংস্থার ভেতরে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়লে,মাদকচক্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে—“মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যদি ভেতর থেকেই দুর্নীতির কবলে পড়ে,তাহলে মাঠ পর্যায়ের মাদকবিরোধী অভিযান গুলো দুর্বল হয়ে পড়বে, এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।” এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে! ডিজি কার্যালয়,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের হাইকমান্ডের কাছে জোর দাবি—এম এ কবিরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
অন্যথায় কর্মচারীদের ক্ষোভ,অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং দুর্নীতি–দৌরাত্ম্য আরও বৃদ্ধি পাবে—এমন শঙ্কা দফতরের অভ্যন্তরে প্রবল।
মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে মাঠে যারা কাজ করে,তাদের দফতরের ভেতর যদি দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে—তাহলে পুরো কাঠামোই ভেঙে পড়ে।
ময়মনসিংহ জেলা ডিএনসি কার্যালয়ের হিসাব রক্ষক এম এ কবিরের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগগুলো শুধু একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে নয়—এটি প্রতিষ্ঠানগত ধসের সতর্কবার্তা! সত্য উদঘাটনে জরুরি তদন্তই এখন সময়ের দাবি।