০৮:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পটুয়াখালীতে বন বিভাগের উদাসীনতায় গাছ চোরাচালান দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বছরে কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি।

  • Reporter Name
  • মোঃ আলী হোসেন মোল্লা ০৩:১৪:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
  • ২১২ সম্পাদক ও প্রকাশক

 

মোঃ মেহেদী হাসান (বাচ্চু) পটুয়াখালী:

পটুয়াখালীতে বন বিভাগের দুর্বল নজরদারি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদাসীনতার সুযোগে জমে উঠেছে গাছ চোরাচালানের রমরমা ব্যবসা। এতে একদিকে যেমন উজাড় হচ্ছে উপকূলীয় বনভূমি, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি গাছ অবৈধভাবে কেটে নদীপথে পাচার করছে। অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের সঙ্গে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশ রয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলায় মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার হেক্টর (৩০ থেকে ৩৭ হাজার একর)। নদী ভাঙন, নতুন চর জাগা ও বনায়ন প্রকল্পের কারণে এ পরিমাণ পরিবর্তিত হলেও কার্যকর তদারকির অভাবে বনভূমি উজাড়ের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, চোরাকারবারিরা সাধারণত রাতের আঁধারে কিংবা নজরদারির বাইরে গাছ কেটে নেয়। টিপি (ট্রানজিট পারমিট) ছাড়াই এসব কাঠ নদীপথে পরিবহন করা হয়। ফলে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়েছে।

সারেজমিনে দেখা গেছে, রাঙ্গাবালী, কুয়াকাটা, মহিপুর,কলাপাড়া,গলাচিপা, মির্জাগঞ্জ, দুমকি, বাউফল ও দশমিনা উপজেলার বিভিন্ন খাল ও নদী তীর থেকে গাছ সংগ্রহ করে ছোট-বড় ট্রলারে তোলা হয়। এসব কাঠ তেতুলিয়া, লোহালিয়া ও পায়রা নদী হয়ে বরিশালের স্বরূপকাঠি নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।

অথচ বনভূমি রক্ষায় মাঠপর্যায়ে ফরেস্ট গার্ড, বিট অফিসার, রেঞ্জারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে তেমন কোনো কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ছে না।

গত ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় পটুয়াখালী লঞ্চ টার্মিনালে জ্বালানি সংকটে থেমে থাকা একটি গাছবোঝাই ট্রলার থেকে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ট্রলার মাঝি রেজাউল করিম জানান, বাউফল আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের কাশিপুর ও হাজিরহাট এলাকা থেকে গাছগুলো তোলা হয়েছে এবং স্বরূপকাঠি বাজারে নেওয়া হচ্ছিল। তবে তার কাছে কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই।

তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই রুটে গাছ আনা-নেওয়া করি। কখনো কোনো বাধা বা অভিযান দেখিনি।

গাছ ব্যবসায়ী হানিফ মোল্লা খোলামেলাভাবে বলেন, আগে বন বিভাগ থেকে টিপি নিতে হতো। গত এক বছর ধরে আর কোনো কাগজ নেইনি, লাগেও না। ব্যবসা ঠিকভাবেই চলছে। কাজ করতে গেলে বন বিভাগের সাথে সম্পর্ক রেখেই করতে হয়।

তার এই বক্তব্যই পুরো চক্রের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগের বিষয়ে পটুয়াখালী সদর রেঞ্জের ফরেস্ট গার্ড আলমগীর হোসেন বলেন, তিন মাস আগে ৩টি ট্রলার আটক করে টিপি আদায় করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। উপজেলা রেঞ্জারদের মাধ্যমে তথ্য আসে, আমরা সেটার ভিত্তিতে কাজ করি।

অন্যদিকে সহকারী বন সংরক্ষক নুরুন্নাহার বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অসুস্থ থাকায় অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে। আমরা বিষয়টি জেনেছি, এখন থেকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে টিপি ছাড়াই কাঠ পরিবহন হলেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও চোরাকারবারিরা কীভাবে এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠল?

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত নজরদারি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে উপকূলীয় বন রক্ষা করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি চোরাচালান সিন্ডিকেট ভাঙতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। নইলে পটুয়াখালীর বনভূমি যেমন হারাবে তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য, তেমনি রাষ্ট্র হারাতে থাকবে বিপুল অংকের রাজস্ব।

www.dailyamaderchetanaypratidin.com Save as PDF

Share this news as a Photo Card

দৈনিক আমাদের চেতনায় প্রতিদিন
About Author Information

Md.Alihossain Molla

Popular Post

পরকীয়ার জেরে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ

PhotoCard Icon
Create PhotoCard
13 June 2026

পটুয়াখালী ভার্সিটির, নবনিযুক্ত ভিসি প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহানকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ এর অভিনন্দন।।

www.dailyamaderchetanaypratidin.com

পটুয়াখালীতে বন বিভাগের উদাসীনতায় গাছ চোরাচালান দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বছরে কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি।

মোঃ আলী হোসেন মোল্লা ০৩:১৪:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

 

মোঃ মেহেদী হাসান (বাচ্চু) পটুয়াখালী:

পটুয়াখালীতে বন বিভাগের দুর্বল নজরদারি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদাসীনতার সুযোগে জমে উঠেছে গাছ চোরাচালানের রমরমা ব্যবসা। এতে একদিকে যেমন উজাড় হচ্ছে উপকূলীয় বনভূমি, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি গাছ অবৈধভাবে কেটে নদীপথে পাচার করছে। অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের সঙ্গে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশ রয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলায় মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার হেক্টর (৩০ থেকে ৩৭ হাজার একর)। নদী ভাঙন, নতুন চর জাগা ও বনায়ন প্রকল্পের কারণে এ পরিমাণ পরিবর্তিত হলেও কার্যকর তদারকির অভাবে বনভূমি উজাড়ের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, চোরাকারবারিরা সাধারণত রাতের আঁধারে কিংবা নজরদারির বাইরে গাছ কেটে নেয়। টিপি (ট্রানজিট পারমিট) ছাড়াই এসব কাঠ নদীপথে পরিবহন করা হয়। ফলে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়েছে।

সারেজমিনে দেখা গেছে, রাঙ্গাবালী, কুয়াকাটা, মহিপুর,কলাপাড়া,গলাচিপা, মির্জাগঞ্জ, দুমকি, বাউফল ও দশমিনা উপজেলার বিভিন্ন খাল ও নদী তীর থেকে গাছ সংগ্রহ করে ছোট-বড় ট্রলারে তোলা হয়। এসব কাঠ তেতুলিয়া, লোহালিয়া ও পায়রা নদী হয়ে বরিশালের স্বরূপকাঠি নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।

অথচ বনভূমি রক্ষায় মাঠপর্যায়ে ফরেস্ট গার্ড, বিট অফিসার, রেঞ্জারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে তেমন কোনো কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ছে না।

গত ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় পটুয়াখালী লঞ্চ টার্মিনালে জ্বালানি সংকটে থেমে থাকা একটি গাছবোঝাই ট্রলার থেকে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ট্রলার মাঝি রেজাউল করিম জানান, বাউফল আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের কাশিপুর ও হাজিরহাট এলাকা থেকে গাছগুলো তোলা হয়েছে এবং স্বরূপকাঠি বাজারে নেওয়া হচ্ছিল। তবে তার কাছে কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই।

তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই রুটে গাছ আনা-নেওয়া করি। কখনো কোনো বাধা বা অভিযান দেখিনি।

গাছ ব্যবসায়ী হানিফ মোল্লা খোলামেলাভাবে বলেন, আগে বন বিভাগ থেকে টিপি নিতে হতো। গত এক বছর ধরে আর কোনো কাগজ নেইনি, লাগেও না। ব্যবসা ঠিকভাবেই চলছে। কাজ করতে গেলে বন বিভাগের সাথে সম্পর্ক রেখেই করতে হয়।

তার এই বক্তব্যই পুরো চক্রের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগের বিষয়ে পটুয়াখালী সদর রেঞ্জের ফরেস্ট গার্ড আলমগীর হোসেন বলেন, তিন মাস আগে ৩টি ট্রলার আটক করে টিপি আদায় করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। উপজেলা রেঞ্জারদের মাধ্যমে তথ্য আসে, আমরা সেটার ভিত্তিতে কাজ করি।

অন্যদিকে সহকারী বন সংরক্ষক নুরুন্নাহার বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অসুস্থ থাকায় অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে। আমরা বিষয়টি জেনেছি, এখন থেকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে টিপি ছাড়াই কাঠ পরিবহন হলেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও চোরাকারবারিরা কীভাবে এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠল?

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত নজরদারি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে উপকূলীয় বন রক্ষা করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি চোরাচালান সিন্ডিকেট ভাঙতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। নইলে পটুয়াখালীর বনভূমি যেমন হারাবে তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য, তেমনি রাষ্ট্র হারাতে থাকবে বিপুল অংকের রাজস্ব।

www.dailyamaderchetanaypratidin.com Save as PDF

Share this news as a Photo Card