০৪:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুকে ধর্ষণ: ৫০ হাজারের ‘শালিশি প্রহসন’ ও শূন্য বিচার!

  • Reporter Name
  • মোঃ আলী হোসেন মোল্লা ০১:০৪:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩১৬ সম্পাদক ও প্রকাশক

The image illustrates the emotional impact of the reported incident.

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ:

বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ধর্ষণ একটি চরম, অমার্জনীয় এবং সম্পূর্ণ জামিন অযোগ্য অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী এ ধরনের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সামাজিক মীমাংসা বা ‘শালিশ’ করার বিন্দুমাত্র আইনি সুযোগ নেই। অথচ ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানাধীন চর নিলক্ষিয়া ইউনিয়নে ১১ বছরের এক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন (মানসিকভাবে অসুস্থ) শিশুকে ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা ঘটিয়ে আজ পর্যন্ত আইনি ফলাফল সম্পূর্ণ শূন্য রাখা হয়েছে। এর আগেও জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পত্রিকায় এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় অবৈধ শালিশ বৈঠক বসিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় বিষয়টি রফাদফা করার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু এতসব সংবাদ প্রকাশের পরও কেন প্রশাসন উপযুক্ত বা প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি—এই প্রশ্নটি আজ জনমনে এক বিশাল রহস্য ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ​ঘটনার পটভূমি ও অবৈধ শালিশের দেওয়াল: গত ১৫ জুন আনুমানিক দুপুর আড়াইটার দিকে চর নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে জন্মগতভাবে মানসিকভাবে অসুস্থ ওই শিশুটি বাড়ির পাশে সুপারি কুড়াতে গেলে প্রতিবেশী আইজুল মুন্সি (৭০) কর্তৃক চরম পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে তৎপর হয়ে ওঠে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন মাতব্বর। আইনের তোয়াক্কা না করে ঘটনার দিন দিবাগত রাত ১২টার দিকে ভুক্তভোগীর নানার বাড়িতে গোপন শালিশ বৈঠক বসানো হয়। ​স্থানীয় মাতব্বর সাইদুল, সুমন ও মানিকদের নেতৃত্বে বসা ওই অবৈধ শালিশে মূল অভিযুক্ত আইজুল মুন্সিকে ‘আইনি ঝামেলা’ থেকে বাঁচাতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয় এবং আগামী সোমবারের মধ্যে সেই টাকা ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে যাতে কেউ মুখ না খোলে, সেজন্য জারি করা হয় মৌখিক নিষেধাজ্ঞা। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সংবাদমাধ্যমে এসব তথ্য বিস্তারিত ভাবে প্রকাশিত হওয়া এবং দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার পরও অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট থানায় তাদের আনাগোনার গুঞ্জন রয়েছে—অথচ আইনি ব্যবস্থার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ​সংবাদ প্রকাশের পরও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা: নেপথ্যের কারণ কী? জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় অবৈধ শালিশ, ৫০ হাজার টাকায় ধর্ষণ ধামাচাপার চেষ্টা এবং লজ্জিত করার মতো সামাজিক অপরাধের চিত্র স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরেও কেন প্রশাসনের টনক নড়ল না? এই প্রশ্নের গভীরে রয়েছে বেশ কিছু কাঠামোগত ও প্রভাবশালী ফাঁকফোকর: ​১. প্রভাবশালীদের অদৃশ্য শক্তির জাল: স্থানীয় মাতব্বর ও অপরাধীরা আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের অধিকারী হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সংবাদ প্রকাশিত হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে সরাসরি এবং সাহসী ভূমিকা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে নামার পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ​২.পুলিশিং ও তদন্তে উদাসীনতা: ঘটনার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এবং গণমাধ্যমে অপরাধীদের নাম ও শালিশের চিত্র স্পষ্টভাবে আসার পরও কেন তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হলো না, সেই জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তরা থানায় যাতায়াত করলেও পুলিশি তৎপরতায় কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। ​৩.নড়বড়ে ও মন্থর ব্যবস্থা: সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশের পর তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও নমনীয় আচরণের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ​আইনের শাসন বনাম বিচারহীনতার সংস্কৃতি: আইন স্পষ্ট ভাষায় বলে, ধর্ষণের মতো অপরাধে শালিশ বা আপস বসানো এবং তা ধামাচাপা দেওয়া অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ। যারা এই শালিশের সাথে জড়িত, তারাও আইনের চোখে সমান অপরাধী। অথচ প্রকাশিত খবরের পরও যদি অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসে, তবে সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। ​এখন সময় এসেছে কেবল আশ্বাস বা দায়সারা বক্তব্যের গণ্ডি পেরিয়ে ময়মনসিংহের এই ঘটনায় জড়িত মূল অভিযুক্ত এবং অবৈধ শালিশের হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার। সংবাদ প্রকাশের পরও প্রশাসনের এই দীর্ঘসূত্রিতার নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে উচ্চপর্যায়ের ত্বরিত হস্তক্ষেপই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Share this news as a Photo Card

দৈনিক আমাদের চেতনায় প্রতিদিন
About Author Information

Md.Alihossain Molla

Popular Post

পটুয়াখালীতে চাঁদা না পেয়ে বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুটের অভিযোগ।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
PhotoCard Icon
Create PhotoCard
28 October 2026

ভান্ডারিয়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

https://dailyalorsomaz.com |
https://www.facebook.com

ময়মনসিংহে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুকে ধর্ষণ: ৫০ হাজারের ‘শালিশি প্রহসন’ ও শূন্য বিচার!

মোঃ আলী হোসেন মোল্লা ০১:০৪:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ:

বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ধর্ষণ একটি চরম, অমার্জনীয় এবং সম্পূর্ণ জামিন অযোগ্য অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী এ ধরনের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সামাজিক মীমাংসা বা ‘শালিশ’ করার বিন্দুমাত্র আইনি সুযোগ নেই। অথচ ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানাধীন চর নিলক্ষিয়া ইউনিয়নে ১১ বছরের এক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন (মানসিকভাবে অসুস্থ) শিশুকে ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা ঘটিয়ে আজ পর্যন্ত আইনি ফলাফল সম্পূর্ণ শূন্য রাখা হয়েছে। এর আগেও জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পত্রিকায় এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় অবৈধ শালিশ বৈঠক বসিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় বিষয়টি রফাদফা করার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু এতসব সংবাদ প্রকাশের পরও কেন প্রশাসন উপযুক্ত বা প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি—এই প্রশ্নটি আজ জনমনে এক বিশাল রহস্য ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ​ঘটনার পটভূমি ও অবৈধ শালিশের দেওয়াল: গত ১৫ জুন আনুমানিক দুপুর আড়াইটার দিকে চর নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে জন্মগতভাবে মানসিকভাবে অসুস্থ ওই শিশুটি বাড়ির পাশে সুপারি কুড়াতে গেলে প্রতিবেশী আইজুল মুন্সি (৭০) কর্তৃক চরম পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে তৎপর হয়ে ওঠে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন মাতব্বর। আইনের তোয়াক্কা না করে ঘটনার দিন দিবাগত রাত ১২টার দিকে ভুক্তভোগীর নানার বাড়িতে গোপন শালিশ বৈঠক বসানো হয়। ​স্থানীয় মাতব্বর সাইদুল, সুমন ও মানিকদের নেতৃত্বে বসা ওই অবৈধ শালিশে মূল অভিযুক্ত আইজুল মুন্সিকে ‘আইনি ঝামেলা’ থেকে বাঁচাতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয় এবং আগামী সোমবারের মধ্যে সেই টাকা ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে যাতে কেউ মুখ না খোলে, সেজন্য জারি করা হয় মৌখিক নিষেধাজ্ঞা। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সংবাদমাধ্যমে এসব তথ্য বিস্তারিত ভাবে প্রকাশিত হওয়া এবং দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার পরও অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট থানায় তাদের আনাগোনার গুঞ্জন রয়েছে—অথচ আইনি ব্যবস্থার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ​সংবাদ প্রকাশের পরও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা: নেপথ্যের কারণ কী? জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় অবৈধ শালিশ, ৫০ হাজার টাকায় ধর্ষণ ধামাচাপার চেষ্টা এবং লজ্জিত করার মতো সামাজিক অপরাধের চিত্র স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরেও কেন প্রশাসনের টনক নড়ল না? এই প্রশ্নের গভীরে রয়েছে বেশ কিছু কাঠামোগত ও প্রভাবশালী ফাঁকফোকর: ​১. প্রভাবশালীদের অদৃশ্য শক্তির জাল: স্থানীয় মাতব্বর ও অপরাধীরা আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের অধিকারী হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সংবাদ প্রকাশিত হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে সরাসরি এবং সাহসী ভূমিকা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে নামার পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ​২.পুলিশিং ও তদন্তে উদাসীনতা: ঘটনার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এবং গণমাধ্যমে অপরাধীদের নাম ও শালিশের চিত্র স্পষ্টভাবে আসার পরও কেন তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হলো না, সেই জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তরা থানায় যাতায়াত করলেও পুলিশি তৎপরতায় কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। ​৩.নড়বড়ে ও মন্থর ব্যবস্থা: সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশের পর তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও নমনীয় আচরণের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ​আইনের শাসন বনাম বিচারহীনতার সংস্কৃতি: আইন স্পষ্ট ভাষায় বলে, ধর্ষণের মতো অপরাধে শালিশ বা আপস বসানো এবং তা ধামাচাপা দেওয়া অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ। যারা এই শালিশের সাথে জড়িত, তারাও আইনের চোখে সমান অপরাধী। অথচ প্রকাশিত খবরের পরও যদি অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসে, তবে সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। ​এখন সময় এসেছে কেবল আশ্বাস বা দায়সারা বক্তব্যের গণ্ডি পেরিয়ে ময়মনসিংহের এই ঘটনায় জড়িত মূল অভিযুক্ত এবং অবৈধ শালিশের হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার। সংবাদ প্রকাশের পরও প্রশাসনের এই দীর্ঘসূত্রিতার নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে উচ্চপর্যায়ের ত্বরিত হস্তক্ষেপই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Share this news as a Photo Card