বিশেষ প্রতিনিধি-মামুনুর রশিদ মামুন:
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য নির্মাণাধীন ৭ তলা আবাসিক ভবন প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে না পারায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রায় ৭ কোটি ৪১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫২ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে কাজের ধীরগতি, নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন এবং অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব এখন স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ৭ জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত এসে নির্মাণ অগ্রগতি সীমাবদ্ধ রয়েছে মাত্র তৃতীয় তলার ছাঁদ পর্যন্ত—যা প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম ধীরগতিরই ইঙ্গিত দেয়। প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত তথ্য: প্রকল্পের নাম: পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ
কাজের ধরন: ৭ তলা ভবন (২৪টি ফ্ল্যাট) চুক্তিমূল্য: ৭,৪১,৪৪,৪৫২.৩৭৭ টাকা। চুক্তির তারিখ: ০১ অক্টোবর ২০২৩। কাজ শুরুর তারিখ: ০৮ অক্টোবর ২০২৩। সমাপ্তির নির্ধারিত সময়: ০৭ জুলাই ২০২৫।
বাস্তবায়নকারী সংস্থা: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED), ময়মনসিংহ। ধীরগতির নির্মাণ—কারণ কী? প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও কাঠামোগত অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত। স্থানীয়দের অভিযোগ,কাজ নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং মাঝেমধ্যেই দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার ঘটনাও ঘটছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়! প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার এবিএম জহিরুল হক জহির-এর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের একাংশ একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি কাজের গতি অস্বাভাবিকভাবে ধীর
বিল উত্তোলনের তুলনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি কম! নির্মাণমান বজায় রাখা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে! রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্প গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে! তবে এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন ঠিকাদার জহিরুল হক জহির। তাঁর দাবি,কাজ নির্ধারিত মান বজায় রেখেই এগোচ্ছে এবং অভিযোগ গুলো উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
বিল উত্তোলনে অসঙ্গতির প্রশ্ন! অভিযুক্ত ঠিকাদারের নিজস্ব ভাষ্যে জানা গেছে,প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা বিল ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। তবে এই দাবি বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে,যদি বিল উত্তোলন ও বাস্তব কাজের অগ্রগতির মধ্যে বৈষম্য থেকে থাকে,তবে তা দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি।
নির্মাণমান নিয়েও উদ্বেগ! নির্মাণ কাজের মান নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে শঙ্কা। অভিযোগ রয়েছে,নিম্নমানের নির্মাণ-সামগ্রী ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না যা ভবিষ্যতে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন অভিযুক্ত ঠিকাদার অতীতে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন,সেগুলোর অনেক গুলোতেই একই চিত্র দেখা গেছে।
তাদের দাবি নিম্নমানের কাজের কারণে অবকাঠামো দ্রুত নষ্ট হয়েছে ভাঙন,ধস ও ফাটলের ঘটনা ঘটেছে সাধারণ মানুষ চলাচলে ঝুঁকির মুখে পড়েছে! স্থানীয়দের ভাষ্যে,“মানুষের ভোগান্তি দেখার যেন কেউ নেই—জনগণই যেন ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার!
সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন: অভিযোগ উঠেছে,বিভিন্ন প্রকল্প থেকে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জন করে ঠিকাদার জহির ইতোমধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—এই বিপুল সম্পদের উৎস কোথায়? প্রশাসনের নীরবতা ও বিভ্রান্তিকর অবস্থান
প্রকল্পটির তদারকি সংস্থা এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সুস্পষ্ট আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তাগাছার নবাগত উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান,“উত্থাপিত এসব অভিযোগ এখনো আমার নজরে আসেনি।”
তার এই বক্তব্য প্রকল্প তদারকিতে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি রয়েছে কি না—সে প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। জনমনে প্রশ্ন—কার ছত্রছায়ায় চলছে এসব? স্থানীয় সচেতন মহল ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রশ্ন—সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও কীভাবে একটি সরকারি প্রকল্প এভাবে ধীর গতিতে চলতে পারে? এর পেছনে কার প্রভাব কাজ করছে? এলজিইডির সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানাই রয়ে গেছে।
প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসন প্রকল্পে—সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন: বিল উত্তোলনে অস্পষ্টতা! সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ,স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। সংশ্লিষ্টদের মতে,প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র উদঘাটন করে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
[চলমান অনুসন্ধান | পরবর্তী পর্বে: প্রকল্পের অর্থ ছাড়,বিল ভাউচার ও তদারকির বাস্তব চিত্র]
Reporter Name 















