নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরে অবৈধ পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনার আবেদন করেছে ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা)। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ‘প্রতিবন্ধী মজিবর’কে ঘিরে রাজউকের সরকারি জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, অবৈধ পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ভাড়া বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওয়াসার চিঠিতে যা বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার জোন-১০-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে (স্মারক নং: ৪৬.১১৩.৪১৫.০০.০০.০০৭.২০২৬-৮৪) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান অবৈধ পানির সংযোগের বিষয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে ওয়াসার একটি পরিদর্শন দল ঘটনাস্থলে গিয়ে দুটি স্থানে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পায়। পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সেক্টর-১৫-এর ব্লক-বি, কূপ নং-২১ সংলগ্ন পানির পাম্প কম্পাউন্ডের পশ্চিম পাশে ‘মজিবর’ নামে এক ব্যক্তি অনুমোদন ছাড়াই টিনশেড ঘর নির্মাণ করে অবৈধভাবে পানির সংযোগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া একই এলাকার হাউস-৭, ব্লক-বি, রোড-১/বি-এর একটি বৈধ পানির মিটার বাইপাস করে একটি হোটেল ও একটি মুদি দোকানে অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওয়াসা জানায়, তাৎক্ষণিকভাবে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে স্থানীয়ভাবে বাধার মুখে পড়তে হয়। তাই জনস্বার্থ, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং সরকারি রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। রাজউকের জমি দখলের অভিযোগ: স্থানীয় সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত মজিবুর রহমান ওরফে ‘প্রতিবন্ধী মজিবর’-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রাজউকের সরকারি জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট এক নেতা সুমনের প্রভাব ব্যবহার করে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা রাজউকের প্রায় ২১ কাঠা সরকারি জমি দখল করে সেখানে টিনশেড ঘর নির্মাণ করেন এবং সেগুলো ভাড়া দিয়ে আসছেন। স্থানীয়দের দাবি, দখল করা জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেও ওই এলাকায় বসবাস করছেন।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দখলকৃত এলাকায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। পাশাপাশি বড় অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মজিবুর রহমানের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাজউক (জোন-১)-এর এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শান্তা রহমান অভিযানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য রাজউকের অথরাইজড অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। রাজউক (জোন-১)-এর অথরাইজড অফিসার এহসানুল ইমাম জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে ২০ জুলাই উত্তরা সেক্টর-১৫-এর ব্লক এ, বি ও ডি এলাকার লেক-সংলগ্ন অংশে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কয়েকটি অবৈধ স্থাপনা আংশিকভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং মানবিক বিবেচনায় অবশিষ্ট স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর অফিস আদেশ অনুযায়ী যেকোনো সময় পুনরায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। মজিবুর রহমানের আবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তবে রাজউক থেকে এ বিষয়ে কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ফলে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের কোনো বৈধ অনুমতি তার নেই। রাজউকের দাবি, মানবিক কারণে তিনি প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাকে ২ মাসের মধ্যে অন্যত্র স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সময়সীমা শেষ হলে তার স্থাপনাও উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় আসবে। ৫৫টির বেশি টিনশেড, নিয়মিত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ: স্থানীয়দের দাবি, সেক্টর-১৫-এর ব্লক এ, বি ও ডি এলাকার লেকপাড়জুড়ে ৫৫টিরও বেশি টিনশেড স্থাপনা রয়েছে। এসব ঘর থেকে মাসিক ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জমি দখল, অননুমোদিত স্থাপনা নির্মাণ, অবৈধ পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ভাড়া বাণিজ্য চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ওয়াসার মোবাইল কোর্টের আবেদন এবং রাজউকের উচ্ছেদ কার্যক্রমের পর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মজিবুর রহমান দুটি বিয়ে করেছেন। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা প্রায় ২১ জন এবং তারা সরকারি জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করে বসবাস করছেন। অভিযুক্ত মজিবুর রহমান বলেন,”আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। অনেক কষ্ট করে রাজউকের জমিতে বাড়ি করেছি। আমাকে কেন আপনারা বিরক্ত করছেন?”এ কথা বলেই তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন,”মজিবর একজন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী। সরকারি জমি দখল করাই তার কাজ। তিনি প্রতিবন্ধী হলেও সেই পরিচয়কে আবেগের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেন। অভিযানে গেলেই নিজেকে প্রতিবন্ধী বলে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।” আরেক বাসিন্দা জাজ মিয়া বলেন, “মজিবর প্রতিবন্ধী হলেও এখন রাজউকের প্রায় ৫০ কোটি টাকার জমি দখল করে কোটিপতি হয়েছেন। তাকে গরিব বলা ঠিক নয়। শুধু জমি দখল নয়, এলাকায় মাদক কারবার নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে।”
Reporter Name 

















