খলিফা সাগর : নিজস্ব প্রতিবেদক।
দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা যেখানে নিয়মিত যাত্রীদের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারছে না, সেখানে মোটরসাইকেলের ট্যাক্স ও ফি বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষ, চাকরিজীবী ও মোটরসাইকেল চালকরা বলছেন, যে দেশে রাষ্ট্রীয় কোনো যানবাহন শতভাগ যাত্রীসেবা দিতে ব্যর্থ, সেখানে মধ্যবিত্তের শেষ ভরসা বাইকের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।
বর্তমানে দেশের বড় শহরগুলোতে বিশেষ করে রাজধানীতে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। অধিকাংশ বাসে যাত্রীদের ঠাসাঠাসি করে, বাদুড়ঝোলা হয়ে যাতায়াত করতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় বাসে উঠতে পারেন না সাধারণ মানুষ। বাসের সার্ভিস অনিয়মিত এবং কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই বললেই চলে।
এমন এক চরম ভোগান্তির পরিস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষ কর্মস্থলে সময়মতো পৌঁছানো এবং পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে মোটরসাইকেলকে একমাত্র নির্ভরযোগ্য বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অফিসগামী ও সাধারণ যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায় এক চরম বাস্তবতার কথা। রাজধানীর একজন বেসরকারি চাকরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
অফিস টাইমে বাসে উঠাই যুদ্ধ জয়ের মতো। তিন ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহানোর চেয়ে কষ্ট করে একটা বাইক কিনেছি। এখন যদি বাইকের ট্যাক্স বাড়ানো হয়, তবে সেই চাপ তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে। সরকার যদি ভালো গণপরিবহন দিতে পারত, তাহলে তো অনেকেই বাড়তি টাকা খরচ করে বাইক কিনতই না।”
ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার মোটরসাইকেল চালক ও রাইডার্স সংগঠনগুলো বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মোটরসাইকেল এখন আর কোনো বিলাসবহুল বা শুধু ব্যক্তিগত বাহন নয়; বরং এটি অনেকের জন্য বাধ্যতামূলক এবং জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ট্যাক্স বাড়ানো হলে এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে ট্যাক্স বাড়ানোর বৈশ্বিক যে নিয়ম রয়েছে, তা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে খাটে না। কারণ এখানে বিকল্প কোনো উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই।একজন শীর্ষস্থানীয় পরিবহন বিশ্লেষক এই সিদ্ধান্তকে ‘উল্টো নীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন:
সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিরাপদ, আরামদায়ক ও পর্যাপ্ত বাস সার্ভিস নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের জন্য বিকল্প ও ভালো গণপরিবহন নিশ্চিত করতে পারবে, তখন ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমাতে ট্যাক্স বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু গণপরিবহনকে ধ্বংসস্তূপে রেখে বাইকের ওপর কর বসানো মানে উল্টো পথে হাঁটা।”
অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রশ্ন তুলেছেন— যেখানে দেশের বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিকারক বা উচ্চবিত্তের ওপর কঠোর কর আরোপের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না, সেখানে মধ্যবিত্তের প্রধান বাহন মোটরসাইকেলের ওপর কেন বারবার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে?
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, মূলত রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে এ ধরনের ট্যাক্স ও ফি বাড়ানোর প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং সবদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন।
সাধারণ জনগণের স্পষ্ট দাবি— করের বোঝা চাপানোর আগে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হোক। যতক্ষণ না রাষ্ট্রীয় বা পাবলিক যানবাহন সাধারণ যাত্রীদের চাহিদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছে, ততক্ষণ মোটরসাইকেলের মতো মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের বাহনের ওপর অতিরিক্ত কোনো কর বা ফি আরোপ না করার জোর দাবি জানিয়েছেন দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ।
Reporter Name 


















